ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। রায় ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন নিহত ছাত্রদের পরিবার, যাদের মধ্যে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিশেষ করে শাহিনা বেগম, যাদের ২০ বছর বয়সী পুত্র সাজ্জাদ হোসেন ছাত্র নেতৃত্বাধীন ২০২৪ সালের বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে নিহত হন, আদালতের রায়ে গভীর কষ্ট প্রকাশ করেন।
প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টসের কাছে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৬ জন ছাত্র নিহত হন। তাদের মধ্যে ৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আরেকজনকে থানার ভেতরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।
রায়ে দেশের প্রতিক্রিয়া
ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে শেখ হাসিনার নির্দেশনা ছিল। জাতিসংঘের তথ্যানুসারে আন্দোলনের সময় প্রায় ১৪০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। তবে হাসিনা ও আসাদুজ্জামান বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, তাই তাদের অনুপস্থিতিতে রায় কার্যকর হয়নি। সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শাহিনা বেগম আল-জাজিরাকে বলেন, এই রায় বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে গভীর আবেগের ঢেউ তৈরি করেছে। তিনি দাবি করেন, যতক্ষণ না হাসিনা দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে, ততক্ষণ শান্তি নেই।
নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া
গাইবান্ধার বাসিন্দা শাহিনা বেগম বলেন, “আমার ছেলেকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, রায় কার্যকর করতে দেরি হওয়া হতাশার। সরকারের উচিত হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা।”
রংপুরের আবু সাঈদের পরিবারও রায়কে সর্বাগ্রিক স্বস্তি হিসেবে দেখেছেন। আবু সাঈদ জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ ছিলেন। তাঁর বাবা মকবুল হোসেন বলেন, “আমার মন শান্ত হয়েছে। হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে **মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা প্রয়োজন।”
ঢাকার চানখাঁরপুলে নিহত দশম শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাসের মা বলেন, “রায় কেবল সান্ত্বনা। যেদিন কার্যকর হবে, সেদিনই ন্যায়বিচার হবে।”
রায়ের কার্যকরতা নিয়ে প্রশ্ন
নাগরিকদের আনন্দের মধ্যেও প্রশ্ন আছে—হাসিনা কি বাস্তবে বিচারকে মুখোমুখি হবেন?
ভারত কি তাকে ও আসাদুজ্জামানকে ফেরত দেবে?
সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন তাদের রক্ষা করতে পারবে কিনা?
নিঃশর্তভাবে রায় কার্যকর করার নিশ্চয়তা কে দেবে?
মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, “শেখ হাসিনা আরও কঠোর শাস্তির যোগ্য। সরকারকে তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।” মুতাসির রহমানের বাবা সৈয়দ গাজী রহমান বলেন, “যারা হাজার হাজার পরিবারের হৃদয় শূন্য করেছে, তাদের রায় **দ্রুত কার্যকর হওয়া উচিত।”
শিক্ষার্থীর এবং সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত একটি মিছিল থেকে স্নাতক শিক্ষার্থী রাফি বলেন, “আমরা হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন চালাব। রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাস্তায় থাকব।”
শাহবাগ মোড়ে ‘মৌলিক বাংলা’ নামে একটি সংগঠন হাসিনার প্রতীকী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বলেন, “এটি বার্তা, যেন আর কোনো স্বৈরশাসক ক্ষমতায় পুনরায় উঠতে না পারে।”
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল রায়কে স্বাগত জানিয়েছে।
Leave a Reply