হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ভারতের অবস্থানই সবচেয়ে বড় বাধা
পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে উঠে আসা শেখ হাসিনা একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মনিরপেক্ষ নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭০–এর দশকের অস্থির রাজনীতির ভেতর দিয়ে তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে এবং পরে তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু দিনের পর দিন কঠোর শাসন ও কর্তৃত্ববাদের অভিযোগের পর শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা থেকে নাটকীয়ভাবে পতন ঘটে তার। ভারতে আশ্রয়ে যাওয়ার পর অনুপস্থিত অবস্থায়ই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে—যা বাস্তবায়িত হতে পারে শুধু তখনই, যদি ভারত তাকে ফেরত পাঠায়।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ২০২৪ সালে দেশব্যাপী দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, দমন-পীড়নে প্রায় দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এই সহিংসতার দায়ে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের ক্ষমতার পর আন্দোলনের তীব্র চাপের মুখে তিনি ভারতে পালিয়ে যান।
ঢাকা এখন তাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানাচ্ছে, যাতে দেশেই তার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়। কিন্তু শেখ হাসিনা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অস্বীকার করে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মোবাশ্বার হাসানের মতে, ‘জনগণের রোষ এড়াতে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পরই তার বিরুদ্ধে রায় এল—এ যেন এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক নাটক।’
রক্তাক্ত অতীত ও রাজনৈতিক যাত্রা
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীর একটি অংশ তার পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করলে তিনি ও তার বোন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় প্রাণে বাঁচেন। এরপর ছয় বছর তাকে নির্বাসনে থাকতে হয় ভারতে। এই সময়ই ভারতের প্রতি তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেন। ক্ষমতায় ফিরে প্রথম মেয়াদে তিনি ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তী দুই দশকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার তীব্র রাজনৈতিক সংঘর্ষ বাংলাদেশে দুই নারীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে—যা ‘বেগমদের লড়াই’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
শাসন, উন্নয়ন ও সমালোচনা
২০০৮ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর শেখ হাসিনা দেশকে দ্রুত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পাশে রাখেন—নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক চুক্তি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করেন। তবে এ সময়েই মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী মত দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ ব্যাপক বাড়তে থাকে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম The Indian Express উল্লেখ করে যে, হাসিনা দিল্লির পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিলেন; কিন্তু দেশের ভিতরে তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কঠোর দমননীতির কারণে।
ছাত্র আন্দোলন ও ক্ষমতাচ্যুতি
যদিও তিনি অতীতে বহু সংকট সামলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল ব্যতিক্রম। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গণআন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিলে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস দমন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ব্যাপক জনরোষের মুখে তার সরকার পতিত হয়।
মোবাশ্বার হাসান বলেন, ‘তিনি সীমা অতিক্রম করেছিলেন। মানুষ, প্রশাসন—সবাই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।’
মৃত্যুদণ্ডের রায়
ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি, বিক্ষোভকারীদের হত্যা ও কঠোর নির্দেশ প্রদান। রায় ঘোষণার পর আদালতকক্ষে করতালি ও কান্নার দৃশ্য দেখা যায়।
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ভারতের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘ভারত আমাদের চিরদিনের বন্ধু। এ মুহূর্তে তারা আমার মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।’
ভারতের সম্ভাব্য অবস্থান – বড় বাধা এখানেই
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে—রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ বাধ্যতামূলক নয়। যেহেতু হাসিনা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন, তাই দিল্লির পক্ষে তাকে ফেরত পাঠানো কঠিন হতে পারে।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুণায়েতও মনে করেন, ভারত খুব সহজে তাকে ফিরিয়ে দেবে না। তার মতে, ভারত এটিকে ‘রাজনৈতিক মামলা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে, এবং হাসিনাও এখনও সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত আপিল করতে পারবেন।
ঢাকা অবশ্য দিল্লিকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে এবং বলেছে যে, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে তাকে ফেরত দিতে হবে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
মৃত্যুদণ্ডের রায় বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক, আঞ্চলিক রাজনীতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা—সবকিছুই এখন ঝুঁকির মুখে।
Leave a Reply