বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় বিধানকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যাখ্যা করা সমাজে অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত ইমাম-খতিব পরিষদের জাতীয় সম্মেলনে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।
তারেক রহমান বলেন, “ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে কোনো বিরোধ, ভিন্নমত বা দলীয় স্বার্থে উদ্দেশ্যমূলক ব্যাখ্যা সমাজে অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি মনে করে, ইসলামের বিধি-বিধান নিয়ে মতবিরোধ রাষ্ট্র ও সমাজে ফিতনা বা মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা উচিত নয়। এ বিষয়ে নেতৃস্থানীয় ওলামা, মাশায়েক, ইমাম-খতিবরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বিএনপি ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে এমন একটি কল্যাণমুখী সমাজ ও সরকার গড়তে চায় যেখানে মুসলমানরা নিরাপদে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন যাপন করতে পারবে। অন্য ধর্মের মানুষরাও শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করতে সক্ষম হবেন। বিএনপি কখনোই ইসলামের মৌলিক নীতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে আপস করবে না।”
সংবিধান ও ইসলামী মূল্যবোধ
তারেক রহমান বলেন, “স্বাধীনতার পর দেশ শাসন করা স্বৈরাচারীরা সংবিধান তৈরি করেছিলেন, যা তখন জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলিত হয়নি। পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ অন্তর্ভুক্ত করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাসের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বর্তমানে সংবিধানে এই বিষয়টি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।”
তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি সর্বদা ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার। ২০২৪ সালে রমজান মাসে হঠাৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং ইফতার মাহফিলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। বিএনপি তখনই এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
কওমি মাদ্রাসা ও ইমাম-খতিবদের স্বীকৃতি
তারেক রহমান বলেন, “২০০৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের আমলে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দাওরে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি, নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৫ হাজারের বেশি মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে লাখ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। প্রায় ৩ লাখ মসজিদে ১৭ লাখ ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিন দায়িত্ব পালন করছেন। এই বিপুল ধর্মীয় মানবসম্পদকে রাষ্ট্রীয় অগ্রগতিমূলক কার্যক্রমের বাইরে রাখলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিএনপি এ ব্যাপারে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে।”
জাতীয় ঐক্য ও ইসলামী নীতিতে সরকারের লক্ষ্য
তারেক রহমান বলেন, “দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ইসলামিক মূল্যবোধ রক্ষায় ঐক্য অপরিহার্য। আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়পরায়ণতা, ইনসাআল্লাহ, এবং মহানবীর আদর্শে ভিত্তি করে দেশ চালাবে। আমরা দেশকে ন্যায়ভিত্তিক ও ইন্সাফভিত্তিক বাংলাদেশে রূপান্তর করতে চাই। এজন্য ইমাম-খতিব, মুয়াজ্জিন, আলেম ও উলামাদের দোয়া ও সমর্থন চাই।”
তিনি আরও বলেন, ইসলামের পাঁচটি মূলনীতি—কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত পালন অপরিহার্য। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ এই বিষয়ে একমত। তবে দলীয় স্বার্থে বা রাজনৈতিক প্রয়োজনে ইসলামের প্রক্রিয়া ও ব্যাখ্যাকে কখনও কখনও ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়। বিএনপি বিশ্বাস করে, আল্লাহর ওপর আস্থা এবং মহানবীর মান-শান রক্ষার মাধ্যমে ইসলাম নিয়ে গবেষণা ও আলোচনা হতে পারে।
ইমাম-মুয়াজ্জিনদের অধিকার ও সার্ভিস রুল
তারেক রহমান বলেন, “ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিনদের চাকরি কমিটির ইচ্ছার উপর নির্ভর করা উচিত নয়। বিএনপি সরকার এদের জন্য সার্ভিস রুল প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে। এছাড়া ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্টকে শক্তিশালী করে তাদের আর্থিক স্বাবলম্বী করার প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।”
তিনি আশ্বাস দেন, আগামী ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার দায়িত্বে এলে এসব উদ্যোগ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবে।
সম্মেলনে উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথি
সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন:
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর হাবিবুল্লাহ মিয়াজী
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী
ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন রাজি
হেফাজতের নেতা জুনায়েদ আল হাবিব
সাত দফা দাবিও তুলে ধরেন মাওলানা আজহারুল ইসলাম।
Leave a Reply